কেতন শেখ- এর গল্প- ঈশ্বর - পর্ব ২
ঈশ্বর
কেতন শেখ
(দ্বিতীয় পর্ব)
গতকাল রাতে যখন হারুন কাকা ফোন করলেন, জাহিদ তখন প্রচণ্ড খিদে নিয়ে দুই মাসের পুরোনো শুকনো মুড়ি চিবিয়ে খাচ্ছে। হারুন কাকা তরল স্বরে বললেন, 'আর কতো মুড়ি খাবা জাহিদ? শোনো ... একটা পার্সেল আছে। সেটা ঈশ্বরগঞ্জের দত্তপাড়া বাজারে দিয়ে আসতে হবে। কাজটা করবা কি না বলো। তুমি এই কাজের জন্য বিশ হাজার টাকা পাবা, আর বাড়তি খরচাপাতি পাবা। মুড়ি খাওয়া বন্ধ করো।'
'কিসের প্যাকেট কাকা?'
'মাদকের। এর বেশি কিছু বলতে পারব না। সকাল সকাল রওনা দাও। বিকাল চারটায় দত্তপাড়া বাজারে সোলেমান নামের একজনকে এই প্যাকেট দিয়ে কালকেই ঢাকা ফিরে আসবা। আমি তোমাকে সোলেমানের নম্বর পাঠাচ্ছি। দত্তপাড়া পৌঁছানোর আগে তাকে ফোন করবা না। তুমি এর আগে ঐ এলাকায় গেছো?'
'জি না কাকা, তবে গৌরীপুর গেছি। ময়মনসিংহ গেছি।'
'ঈশ্বরগঞ্জ কাছাকাছিই। দত্তপাড়াও পরিচিত বাজার, এলাকার সবাই জানে। সদরে পৌঁছে যাকে জিজ্ঞেস করবা, রাস্তা বলে দেবে।'
'ঈশ্বরগঞ্জ পর্যন্ত কোন ট্রেনে যাব কাকা? কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসে যাব নাকি গৌরীপুর হয়ে যাব?'
'হারুন কাকা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিরক্ত স্বরে বললেন, কথা আগ বাড়ায়ে বলবা না। কেমনে যাবা সেইটা আমিই বলব। তুমি নতুন, তুমি সরবরাহ দালালীর অনেক কিছুই জানো না। ট্রেনে এইসব জিনিস নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে নিয়মিত তল্লাশি হয়।'
'স্যরি কাকা।'
'মহাখালী থেকে ঈশ্বরগঞ্জের বাসে যাবা। ভায়া কিশোরগঞ্জ। সকাল দশটায় বাস ছাড়বে।'
'জি কাকা।'
'মহাখালীতে আমার লোক তোমাকে পার্সেল দেবে, স্পেশাল ব্রিফকেইস দেবে। সেই ব্রিফকেইসে বিমার কাগজপত্রও থাকবে, পার্সেলও থাকবে। তুমি মহাখালী যাবা খালি হাতে। আমার লোক তোমাকে ব্রিফকেইস দিয়ে এরপর নির্ধারিত বাসে উঠায়েও দেবে। সব ব্যবস্থা করা আছে। তার নাম ঠিকানা তোমাকে পাঠানো হবে।'
জাহিদ ইতস্তত করে বলল, 'কাকা, বাসে পুলিশের তল্লাশি হলে কী করব?'
'গাজীপুর পর্যন্ত কেউ তোমাকে তল্লাশি করবে না। সেই ব্যবস্থা করা আছে। গাজীপুর পার হলে ঈশ্বরগঞ্জ সদর পর্যন্ত আর কোনো চিন্তা নাই। তুমি বাস থেকে নেমে যাবা সেতু পার হয়ে তারুন্দিয়া মোড়ের ঠিক আগে। পুলিশের তল্লাশি চেকপোস্ট বসবে তারুন্দিয়া মোড়ের পরে, বুলু মার্কেটের সামনে। ঐ পর্যন্ত যাবা না। বুঝতে পেরেছো?'
'জি কাকা। বুঝেছি।'
'সুটকোট পরে ভদ্রলোক সেজে যাবা। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবা তুমি বিমা বিক্রি করতে যাচ্ছো। সুটকোট পরা বিমা বিক্রেতাকে কেউ সন্দেহ করে না।'
অনৈতিক কাজকর্মে থেকেও হারুন কাকার হৃদয় প্রশস্ত।
তিনি জাহিদকে স্নেহ করেন। আলাপন শেষে রাতেই খরচাপাতি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিলেন। মুঠোফোনের বার্তায় লিখলেন, 'মুড়ি খাওয়া বন্ধ করে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করো। হোটেলে যাও, ভাত তরকারী পোলাও বিরিয়ানি খাও। কাজ শেষ করলে বিশ হাজার টাকা পেয়ে যাবা।'
নতুন কাজ নিয়ে ভয় বা শঙ্কা থাকলেও সকালে মহাখালীতে প্রাথমিক কাজগুলো ঠিকঠাক মতোই হয়েছে। হারুন কাকার লোক যেখানে থাকার কথা সেখানেই ছিলো।
নতুন ব্রিফকেইস, সেটাতে তাকের নিচে গুপ্তঘরে মাদক পোটলার সবটাই জাহিদ বুঝে শুনে নিয়েছে। বাসে উঠার সাথে সাথে চালক গম্ভীর স্বরে বললেন, 'আপনে হারুন সাহেবের লোক, আপনারে বসতে হবে তৃতীয় সিটে।'
খুবই গোছানো ব্যবস্থা। জাহিদের মুঠোফোনের বার্তায় সোলেমানের নম্বরও তখনই এসেছে। তাকে যোগাযোগ করতে হবে দত্তপাড়া পৌঁছানোর পর। হারুন কাকার কথামতো গাজীপুর পর্যন্ত কোনো তল্লাশি হলো না। গাজীপুর চৌরাস্তার কাছে চোকপোস্ট ছিলো.. কিন্তু সেখানে বাস থামানোর নির্দেশ দেয়া হয়নি। গাজীপুরের পরে রাস্তাও বেশ ভালো। কিশোরগঞ্জের আগে বাস থামবে না। জাহিদ কিছুক্ষণ ঘুমিয়েও নিলো।
চলবে...

Comments
Post a Comment