কেতন শেখ- এর গল্প- ঈশ্বর - পর্ব ১

 


ঈশ্বর 

কেতন শেখ

(প্রথম পর্ব)


শিমুলতলী মোড়ে বাস থামিয়ে ধমকের স্বরে চালক বললেন, 'ঈশ্বরগঞ্জের যাত্রীগণ এইখানে নামেন। সামনে চেকপোস্ট। বাস আর সামনে যাবে না।'

বাস থেকে নেমে জাহিদ হকচকিয়ে গেলো। দুইশ গজ দূরে পল্লী বিদ্যুৎ ভবনের সামনে তারকাঁটার অবরোধ দিয়ে পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। সেখানে পুলিশ বাহিনীর দু'টো নীলরঙা পিকআপ আর একটা জংধরা আসামী গাড়ি। এলাহী আয়োজন।

 হারুন কাকার কথামতো পুলিশের তল্লাশি চেকপোস্ট থাকার কথা নরসুন্দা নদীর সেতু পার হয়ে বুলু মার্কেটের কাছাকাছি রাস্তায়। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশ হারুন কাকার অনুমান অনুযায়ী কাজ করেনি... সেতুর আগেই তল্লাশির ব্যবস্থা করে রেখেছে। এর অর্থ হচ্ছে যে ঈশ্বরগঞ্জ সদরে ঢোকার আগেই তারা সব তল্লাশি সেরে ফেলতে চায়।


তল্লাশি নিয়ে যার দুশ্চিন্তা নেই, সেটা করার জন্য পুলিশের স্থান পরিবর্তন করা নিয়েও তার হকচকানোর কোনো কারণ থাকার কথা না। দৈনন্দিন জীবনে পুলিশি তল্লাশির কোনো ভয় জাহিদকে বিচলিত করে না। ও কাজ করে একটা বিমা প্রতিষ্ঠানে। বিমার কাজে এখানে সেখানে বাসে বা ট্রেনে যাতায়তের সময় ও অনেকবারই পুলিশী তল্লাশির মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র, জাতীয় পরিচয় কার্ড বা ব্রিফকেইসে বিমা প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র দেখে পুলিশ ওকে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই ছেড়ে দেয়। শারীরিক তল্লাশিও করে না। সামনের পথে কোনো ঝামেলা বা গন্ডগোল থাকলে বলে, 'অন্য রাস্তা দিয়ে যান। এই রাস্তায় সামনে বিপদ আছে।'


পুলিশ যেটা ভেবেই এই কথা বলুক, জাহিদের কাছে এই কথা দার্শনিক তত্ত্বে সত্য। বিমা প্রতিষ্ঠানের চাকরির রাস্তায় আপাতত সামনে সত্যিই অনেক বিপদ আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সেবার ব্যাপারে কর্মজীবী মানুষের সম্মান, আস্থা, শ্রদ্ধার সবটাই এখন বিলুপ্ত। বিমা বিক্রির বাজার এখন ধ্বংসপ্রায়। মানুষ এখন সহজে বোকা হয় না। বিমার কথা বললে তারা হেসে উড়িয়ে দেয়। তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে, 'নিজে মরলে কে কী পেলো কেমনে দেখবো ভাই? বেঁচে থেকেই কে কী পেলো সেটা দেখতে পাই না... আর মরণের পরে তো এমনেই সব আন্ধার...


অকাট্য যুক্তি। জাহিদের ধারণা পাশ্চাত্যে যারা বীমা বিক্রয়ের তত্ত্ব তৈরি করে বিপণন-দর্শনের বই লিখেছে, সেসব জ্ঞানীগুণীরা বাংলাদেশের মানুষের এই যুক্তির মুখোমুখি হয়নি। যদি হতো, তাহলে হয়তো তারা নতুন তত্ত্ব লিখতো, বা কোনো তত্ত্বই লিখতো না। জাহিদ চাকরি করে মাসিক পাঁচ হাজার টাকার একটা নামমাত্র বেতনে। ওর আসল উপার্জন বিমা বিক্রির দালালির ভিত্তিতে। প্রতি বিমা বিক্রিতে ওর কমিশন এককালীন বিমামূল্যের দুই শতাংশ। গত ছয় মাসে জাহিদ একটা বিমাও বিক্রি করতে পারেনি। এর অর্থ হচ্ছে যে গত ছয় মাস ঢাকা শহরে জাহিদকে ধার-দেনা করে চলতে হয়েছে।

জাহিদের ঘাড়ে এখন ধারের সেই পাহাড়। এরকম পাহাড় ঘাড় থেকে ফেলার জন্যে বিমা বিক্রির বাইরে উপার্জনের চিন্তা করতে হয়। জাহিদ সেই চিন্তাই করেছে। আরো আগে ওর মতোই চিন্তা করেছিলেন হারুন কাকা। তিনিও একসময় এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। এখন নিজে ধান্দা আর ব্যবসা দিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছেন। তার অফিস বনানীতে। তবে তাকে অফিসে কম আর ফোনে বেশি পাওয়া যায়।


রপ্তানি আমদানি বাণিজ্যের নামে ব্যাবসা করলেও হারুন কাকা বেনামে আরো অনেক ধরনের ধান্দা করেন। সেসবের বেশিরভাগই আইন বা নৈতিকতা বহির্ভূত। এমন ধান্দায় থানা পুলিশের ভয়ও থাকে। হারুন কাকাদের মতো মানুষের অবশ্য গ্রেফতারের বঝুঁকি কম। সেই বঝুঁকি নিয়ে পথে-ঘাটে ঘুরে তার এজেন্ট বা দালালরা। পুরোনো এজেন্টরা আইন বা পুলিশের সাথে ঝাকাঝাকি বা খেলাধূলা করে অভ্যস্ত। কিন্তু জাহিদের মতো ছা-পোষা বিমা বিক্রেতা এবং ঋণগ্রস্তরা হারুন কাকার স্থায়ী এজেন্ট হয় না। ওর কাজ ওয়ান-অফ ভিত্তিতে। কোথাও কোনো এজেন্ট বেশি পরিচিত হয়ে গেলে সেখানে নতুন কাউকে দালাল করে একবারের জন্য পাঠানো হয়। আজকে জাহিদের সেই একদিনের ওয়ান অফ কাজ। একদিনের কাজে হয় ছক্কা না হয় অক্কার সম্ভাবনা থাকে। সেটা জাহিদের অজানা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে আজকে অক্কা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।


আজকে জাহিদের কাজ হচ্ছে দত্তপাড়া বাজারে সোলেমান নামের একজনকে হারুন কাকার দেয়া চারটা মাদকের পোটলা সরবরাহ করা। ওর নতুন এই ব্রিফকেইসের ভেতরে বিমার কাগজপত্রের নিচে একটা গোপন তাক করা হয়েছে। সেই তাক সাধারণ দৃষ্টিতে কেউ বুঝবে না। তাকের নিচে লুকোনো আছে চারটা মাদকের পোটলা। সেখানে কি মাদক আছে সেটা জাহিদ জানে না। তবে ও জানে যে ব্রিফকেইস খুলে খোঁচাখুঁচি করলে গুপ্ত তাক সরিয়ে পোটলা আবিষ্কার করতে পুলিশের এক মিনিটও লাগবে না।


চলবে...

Comments

Popular posts from this blog

কেতন শেখ-এর কবিতা - রঙ

The Price of Money - Joishtho 1432

কেতন শেখ-এর কবিতা - ঘনান্ধকার