কেতন শেখ- এর গল্প- ঈশ্বর - পর্ব ৩
ঈশ্বর
কেতন শেখ
(তৃতীয় পর্ব)
পৌষ মাসের অপরাহ্ন। রোদের আতপে শীতের কোনো আভাস নেই। শিমুলতলী মোড়ের সামনে পুলিশের তারকাঁটা অবরোধ পর্যন্ত ঘিঞ্জি হয়ে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক জনপদ। গাড়ি মেরামতের গ্যারাজ, ব্যাটারি আর গাড়ির পার্টসের কিছু দোকান, দুই-একটা টং দোকানে চা, সিগারেট বা মনোহারী খাবার। কাছাকাছি একটা ভাতের হোটেলে রমরমা ব্যবসা হচ্ছে। জাহিদের খিদে পায়নি। কিন্তু চায়ের তেষ্টা পাচ্ছে। গত দুইমাস প্রায় সব দুপুরেই চা আর বনরুটি বা কলা খাওয়া হয়েছে। সেই অভ্যেসে পেট এখন রপ্ত। হারুন কাকার দেয়া খরচাপাতির টাকা পকেটে থাকলেও পেট সেটা মানছে না। পেট চা খুঁজছে।
এই মফস্বলে সকালে হয়তো পৌষের অনুষ্ণতার ছোঁয়া ছিলো। দুপুরের গরমেও তাই দোকানের কিছু কর্মচারীর পরনে উলের সোয়েটার। দুপুরের গরমেও তারা সোয়েটার খুলে রাখেনি। জাহিদের পরনে সুটকোট। কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ। গরমে জাহিদের সর্বনাশা অস্বস্তিবোধ হচ্ছে। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মনে হচ্ছে কোট খুলে হাতে নিলে কিছুটা স্বস্তি লাগবে। সাথে আনা বোতল থেকে জাহিদ এক ঢোক পানি খেলো। এরপর সবচেয়ে কাছের টং দোকানে এসে হালকা স্বরে বলল, 'ভাই, চা হবে?'
'রং চা, লেবু চা, আদা চা নাই ভাই। শুধু দুধ চা আছে।' 'দুধ চা-ই দেন। চিনি বেশি দেবেন।'
' দুধ চা ছয় টাকা। এক্সট্রা চিনি হইলে আট টাকা।'
জাহিদ পকেট থেকে দশ টাকার নোট বের করে দিলো। টং দোকানের বেঞ্চে একজন লোক বসে আছে। তার পাশে বসার জায়গা আছে। কিন্তু জাহিদ সেখানে বসল না। লোকটার গায়ে একটা ছালা। হাতে একটা লগি বৈঠার মতো কিছু। গায়ের রঙ তামাটে, রোদে পুড়ে ঝলসে গেছে। কোটরে বসা স্বচ্ছ চোখ। তার দৃষ্টি অদূরে, পুলিশের চেকপোস্টের দিকে। চেহারায় গালপাট্টা কাঁচাপাকা দাড়ি। অভাবক্লিষ্ট ভেঙে যাওয়া চোয়ালের অনেকটাই ঢেকে আছে সেই দাড়িতে। তার দষ্টি ভাবলেশহীন। সেখানে কোনো কথা নেই।
অপরাহ্নের আতপ থেকে বাঁচার জন্য টং দোকানের ওপরে চার খুঁটিতে লাগানো একটা চৌকণা তেরপোল। জাহিদ সেই তেরপোলের ছায়ায় ঢুকে লক্ষ্য করল যে বেছে বসা সেই লোকটার গলায় তিন-চারটা সাদাকালো বর্ণের বিভিন্ন হার ঝুলছে। অবয়বে বাউল, দরবেশ বা সন্ন্যাসী মনে হলেও বসে থাকা এবং তাকানোর ভঙ্গিতে তাকে একেবারেই অপ্রকৃতস্থ বা ভবঘুরে লাগছে না। বরং মনে হচ্ছে সে একজন চরম সেয়ানা লোক, কিন্তু ঢং ধরা সন্ন্যাসী। এসব লোকজনের গুপ্ত উদ্দেশ্য বা বিধেয় থাকে। কে জানে হয়তো সে একজন স্থানীয় বাটপার, টং দোকানের মালিকের সাথে চুক্তি করে ঈশ্বরগঞ্জে আসা লোকজনের সাথে বাটপারি করে টাকাপয়সা হাতিয়ে নেয়। অথবা হতে পারে সে গোয়েন্দা বিভাগের ছদ্মবেশী অফিসার, পুলিশি তল্লাশির আগে টং দোকানে ছদ্মবেশে বসে আছে, যেন সন্দেহভাজন বাসযাত্রীদের সাথে আলাপ পরিচয় করে সব তথ্য জেনে এরপর তাদেরকে গ্রেফতার করা যায়।
জাহিদ নিঃশব্দে ঢোক গিলল। সাথে রাখা বোতলে পানি নেই। আশেপাশে চাপকল থাকলে বোতলটা ভরা যেত। দশ টাকার কমে এখন পানির বোতল পাওয়া যায় না। পানির জন্য দশ টাকা খরচ করার কোনো মানে নেই। অভাবের দিনে দশ টাকায় মুড়ি চানাচুর খেয়ে একবেলার খাওয়া হয়। চা-অলা ভাই খুব সম্ভবত জাহিদের তেষ্টা টের পেয়েছে। সে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বলল, 'পানি খান ভাই। দুই টাকা ভাংতি নাই, তাই মিনারেল পানি দিলাম এক গ্লাস।'
'পানির জন্য পৃথিবী, নাকি পৃথিবীর জন্য পানি? বলেন। তো কোনটা সঠিক?'
অন্যদিকে তাকিয়েই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে ছালা পরা সেই লোক। তার কথায় শুদ্ধ বাংলা, কোনো আঞ্চলিক টান নেই। শূন্যে ছুড়ে দেয়া এই ধরনের প্রশ্ন হচ্ছে বাক্যালাপের প্রথম ধাপ। টাউট বাটপার ধরনের মানুষজন এভাবেই কথোপকথন শুরু করে। যত্নে করা এই প্রশ্নে এরা আঞ্চলিক টান রাখে না। এই প্রশ্ন হচ্ছে একটা ফাঁদ। উত্তরে কিছু বললেই ফাঁদে পা দেয়া হবে। এরপর শুরু হবে ব্যক্তিগত তথ্যের প্রশ্ন- 'বাড়ি কোথায়, কোথায় যাবেন, ঈশ্বরগঞ্জে কী কাজ ইত্যাদি।'
চলবে...

Comments
Post a Comment