অর্থের অর্থ - বিন্দু জলে সিন্ধু – ক্ষুদ্র সঞ্চয়

 


অর্থের অর্থ

বিন্দু জলে সিন্ধু – ক্ষুদ্র সঞ্চয়


বৈশাখ সংখ্যায় লিখেছিলাম আর্থিক সাক্ষরতা ও ব্যাংক একাউন্ট নিয়ে। এই সংখ্যায় লিখছি ব্যাংকে অন্তর্ভুক্তি কিভাবে ক্ষুদ্র সন্চয়ের জন্য খুব কার্যকরী হতে পারে, এবং কিভাবে সেই অভ্যেস তৈরি করে তার পুরো ফায়দা নেয়া যায়, সেটা নিয়ে।


নগদের (বদ)অভ্যেস

বছর দশেক আগেও দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ টাকার ব্যবহার ছিলো সবচেয়ে প্রচলিত। ডিজিটাল মাধ্যম, ব্যাংক কার্ড বা চেক দিয়ে লেনদেনও ছিলো, কিন্তু সেটা খুব একটা জনপ্রিয় ছিলো না, এবং বিক্রেতারা সবখানে সেটার যথেষ্ট ব্যবস্থাও করেননি। দৈনন্দিন লেনদেনের মতো ক্ষুদ্র সন্চয়ের জন্যেও আমরা নগদ টাকা এবং ঘরের কোনো একটি গোপন ব্যবস্থায় সেই টাকাকে গচ্ছিত রাখার অভ্যেসে ছিলাম। কোভিডের পর থেকে এই প্রথাগুলোর একরকম জোরপূর্বক পরিবর্তন হয়েছে।

২০২০ থেকে ডিজিটাল বা অন্যান্য নগদহীন ব্যবস্থায় লেনদেন করার অভ্যেসটা আমরা সবাই রপ্ত করেছি। আমাদেরকে সেটা করতে হয়েছে। আমরা তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে, যদি ঘরে বসে লেনদেন করতে হয়, তাহলে ঘরে জমানো নগদ টাকা খুব একটা কাজের না-ও হতে পারে। সমাজে অপরাধ-প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের আরেকটি বোধোদয়ও হয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি যে পকেটে অনেকগুলো নগদ টাকা নিয়ে চলাফেরা করাটা ঝুঁকিপূর্ণ। ছিনতাই, লুটপাট বা চুরির অপরাধ দূর্ভাগ্যজনক হলেও একটি দৈনন্দিন শঙ্কা। এগুলোকে যদি বন্ধ করাও যায়, পকেটভর্তি নগদ টাকা হারিয়ে যাওয়ার ভয়টা কিন্তু উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ঠিক তেমনি ঘরের মাটির ব্যাংক, টিনের বাক্স, মুড়ির টিন, চালের বস্তা, জাজিমের নিচ, বা সোফার গদির ভেতরে যে ইমার্জেন্সি সন্চয় বা গচ্ছিত সম্পদ রাখাটা ঝুঁকিপূর্ণ, সেটাও আমরা বুঝতে পারছি। হয়তো এসব ঝুঁকির কারণে কোভিডের সময় থেকে আমরা অনেকেই ডিজিটাল ও নগদহীন লেনদেন এবং সন্চয়কে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যেসে পরিণত করেছি। এই সচেতনতা ও অভ্যেসের পরিবর্তন আমাদের সবার জন্যেই ইতিবাচক। কিন্তু তার পরেও আমরা নগদ টাকা ঘরে রাখছি, এবং আমাদের অনেকে এখনও নগদ টাকার লেনদেন ও সন্চয়েই বেশি আগ্রহী।

আজকের লেখায় এই বিষয়ে তিনটি প্রশ্ন নিয়ে আমি আলোচনা করবো। সেগুলো হচ্ছে,

১. নগদ টাকা ঘরে রাখার অভ্যেসটা যেতে এতো দেরি হচ্ছে কেন?

২. ব্যাংক বা ডিজিটাল মাধ্যমে ক্ষুদ্র সন্চয় করার নতুন অভ্যেসে আমরা কিভাবে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করবো? এবং

৩. এই অন্তর্ভুক্তির সুফল কি কি হতে পারে?


ঘরে ক্ষুদ্র সন্চয় – কেন এই ঢিঁট অভ্যেস?

বাড়ির নিচে আসা ঠেলাগাড়ি বা ফেরিঅলার থেকে সবজি, ফল বা মুরগি কেনার জন্য এখনও আমাদের নগদ টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। অনেকে গৃহসেবীদের বেতন দিচ্ছেন নগদ টাকায়। বকশিশ বা রিকশা ভাড়ায় নগদ টাকা ব্যবহার হচ্ছে। উবারের চালকও অনেক সময় নগদ টাকায় পারিশ্রমিক দাবী করছেন। আমার পরিচিত অনেকেই বাড়িভাড়া বা সার্ভিস চার্জ দিচ্ছেন ক্যাশে, এবং বিনিময়ে হাতে লেখা রশিদ নিচ্ছেন। ডিজিটাল পদ্ধতির নিরাপদ এবং আইনী রশিদ-অন্তর্ভুক্ত লেনদেনকে অগ্রাহ্য করে চাহিদা বা সুবিধার প্ররোচনায় আমরা প্রতিনিয়ত নগদ টাকার ঝুঁকিপূর্ণ ও অলিখিত লেনদেনে জড়াচ্ছি। এরকম অনেক লেনদেনে কর ফাঁকি দেয়া হচ্ছে, জাল নোট ব্যবহার হচ্ছে, বা অনেকেই অসাধুচক্রের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

নগদ টাকায় লেনদেনের এতো চাহিদার কারণেই হয়তো আমরা ঘরে নগদ টাকা গচ্ছিত রাখছি। আর তাই মাটির ব্যাংক, মুড়ির টিন, তোশকের নিচ বা সন্চয়ের হেতু-লিখিত খামে আমরা নগদ সন্চয় করছি। এই সন্চয় কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্ষেত্রবিশেষে কতোটা স্বল্প কার্যকরী, সেটা জেনে বা না জেনেও আমরা ভাবছি, আমি সাবধান আছি, আমার টাকার কিছু হবে না ... আর আমি তো জমাচ্ছি, একদিন এই টাকা দিয়ে সব হবে।

আমি মনে করি এই প্রচন্ড ঢিঁট অভ্যেসের নেপথ্যে তিনটি বিভ্রম কাজ করে। এর প্রথমটি হচ্ছে, পরিবর্তনের সাথে একাত্ম হওয়ার ভয়। এই ভয়ের অনেকটাই আসে অগ্রজদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের গোঁড়ামী থেকে, যেটার সাথে দ্বিতীয় বিভ্রম জড়িত ... যা হচ্ছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার প্রতি আমাদের অনাস্থা, এবং ক্ষুদ্র সন্চয়ের হিসেব রাখার অনীহা (ভুল করে এটা ভেবে যে, না গুনে টাকা জমালে একদিন এখানে অনেক টাকা হবে)। আরেকটি বিভ্রমের উত্স হচ্ছে ব্যাংক বা ডিজিটাল মাধ্যমে ক্ষুদ্র সন্চয় রাখার সুফল সম্পর্কে পুরোপুরি না জানা, বা জানার অনাগ্রহ।

এসব থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব নয়, তবে খুব সহজও নয়। যদি অসম্ভব হতো, তাহলে কোভিডের সময় আমাদের অর্থনীতি ধ্বসে পড়তো। আর যদি সহজই হতো, তাহলে এই লেখাটা আমাকে লিখতে হতো না।

 

ব্যাংকে ক্ষুদ্র সন্চয়ের অভ্যেস

যে কোনো বদঅভ্যেস পরিবর্তনের জন্য নতুন ভালো অভ্যেসটিতে প্রথমে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এরপর ডেকে আনতে হবে অন্যদের। ব্যাংকের এ্যাপ বা অনলাইন মাধ্যম বা অন্য কোনো নিবন্ধিত ডিজিটাল মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তি (বৈশাখ সংখ্যার আলোচনার বিষয়বস্তু) আমাদের জন্য ক্ষুদ্র সন্চয়ের ব্যবস্থাটা খুবই সহজ করে দেয়। একটি মুঠোফোন বা ঘরের কম্পিউটারে বসে প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার করে আমরা খুব সহজেই আমাদের ব্যাংক বা ডিজিটাল একাউন্টের পাশাপাশি একটি ক্ষুদ্র সন্চয় একাউন্ট করতে পারি। আমাদের ঘর যারা যত্ন করে রাখেন, তাঁরা অনেকেই দিনশেষে বা সপ্তাহ শেষে খুচরো টাকা কোথাও সন্চিত রাখেন। ঠিক তেমনভাবেই ব্যাংক একাউন্টের দৈনন্দিন লেনদেন শেষে খুচরো টাকা অন্য একাউন্টে পাঠিয়ে দেয়া যায়।

যেমন ধরুন একদিন লেনদেন শেষ করে রাত দশটায় আমি দেখলাম আমার ব্যাংক বা ডিজিটাল একাউন্টে ১০১০৭ টাকা আছে। আমি ১০৭ টাকা সরিয়ে রাখলাম আমার ক্ষুদ্র সন্চয় একাউন্টে। পরদিন সকালে আমি লেনদেন শুরু করলাম ১০০০০ টাকা থেকে। এভাবে প্রতিদিন যদি আমি খুচরোগুলো অন্য একাউন্টে সরিয়ে রাখি, তাহলে মাস শেষে আমি জানবো যে আমার ক্ষুদ্র সন্চয়ের পরিমাণ কতো। হয়তো আমার ঘরের আরেকজন মানুষ কোথাও নগদ টাকা গচ্ছিত রেখে ক্ষুদ্র সন্চয় করছেন। হয়তো ডিজিটাল ব্যাংকিং-এ ক্ষুদ্র সন্চয় করার অভ্যেসটা তিনি রপ্ত করতে পারেননি। আমি যদি তাঁর ব্যাংক একাউন্ট করে দেই, তাহলে তাঁকেও আমি এই একই উপায়ে ক্ষুদ্র সন্চয় করতে আগ্রহী করতে পারি। শুধু তাই-ই না, তাঁর অতি যত্নে করা নগদ খুচরো সন্চয়টাও সপ্তাহ বা মাস শেষে তাঁর একাউন্টে জমা দেয়ার পরামর্শ দিতে পারি।

শিশু-কিশোরদের এই অভ্যেসে নিয়ে আসার দায়িত্বটাও আমাদেরই। তাদেরকে ব্যাংকিং-এ অন্তর্ভুক্ত করার সাথে সেই মাধ্যমেই নিয়মিত সন্চয় করার জন্য আগ্রহী করাও খুবই জরুরী। গৃহসেবীদের বেতন, বিদ্যুত বা গ্যাস বিল, সার্ভিস চার্জ, বাড়ি ভাড়া এসবের কোনোটাই নগদে না দিয়ে ডিজিটাল মাধ্যম বা ব্যাংকের মাধ্যমে দিতে হবে। নইলে এসব লেনদেনে ঝুঁকি থাকবে। এই অভ্যেসের কারণে হলেও আমরা সবাইকে ব্যাংক বা ডিজিটাল লেনদেনমুখী করতে পারবো। যখন অর্থের লেনদেন সেভাবে হবে, অর্থের ক্ষুদ্র সন্চয়ও সেই একই মাধ্যমে হবে।

 

ব্যাংক ও ডিজিটাল মাধ্যমে ক্ষুদ্র সন্চয়ের সুফল

ক্ষুদ্র সন্চয়ের সুফল সম্পর্কে আমরা সবাই-ই জানি। বিন্দু জলেই সিন্ধু, আর তাই অল্প বয়স থেকে ক্ষুদ্র সন্চয়ের অভ্যেসটা আমাদেরকে অর্থের অর্থ বুঝায়। ব্যাংক বা ডিজিটাল মাধ্যমে ক্ষুদ্র সন্চয়ের সুফলটা কিন্তু আরও বেশি, এবং এখনও আমরা অনেকেই সেই সুফলগুলো সম্পর্কে পুরোটা জানি না। ব্যাংক বা ডিজিটাল মাধ্যমে ক্ষুদ্র সন্চয় হলে আমাদের অর্থ সর্বোচ্চ সুরক্ষা পায়, কারণ এই মাধ্যমগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় সুরক্ষিত। এর মানে হচ্ছে যে ব্যাংক বা ডিজিটাল মাধ্যমটি কখনও অকার্যকর বা দেউলিয়া হলেও আমাদের গচ্ছিত অর্থের নিশ্চয়তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেবে।

সুনাগরিক হয়ে গর্বিত হওয়ার জন্য অর্থনীতির একজন সক্রিয় অংশীদার হওয়া আবশ্যক। ব্যাংক বা ডিজিটাল মাধ্যমে রাখা সন্চয়ের উপার্জন আয়করের আওতাভুক্ত হবে। যথাযত কর দিয়ে আপনি একজন সুনাগরিক হতে পারবেন, এবং আপনার সন্চয়ের সন্চালনে ব্যাংক যখন বিনিয়োগকারীদের সাহায্য করবে, আপনি দেশের অর্থনীতির একজন সচেতন ও সক্রিয় অংশীদার হবেন। ক্ষুদ্র সন্চয় ব্যাংকে রাখার কারণে এবং ব্যাংক বিনিয়োগের অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে আপনি আয়করের একটা অংশে প্রণোদনামূলক ছাড়ও পেতে পারেন। এই বিষয়গুলোর বিস্তারিত আপনি আপনার ব্যাংকের কর্মকর্তার সাথে আগেই আলাপ করতে পারবেন।

ব্যাংক বা ডিজিটাল মাধ্যমে রাখা ক্ষুদ্র সন্চয়ের হিসেবটাও দৈনন্দিন জীবনে রাখা সহজ। যে কোনো দূরদর্শী ব্যয়বহুল পরিকল্পনার (যেমন বিবাহ, গৃহায়ন, ব্যবসার পুঁজি, উচ্চশিক্ষা, চিকিত্সা) জন্য আর্থিক অভিষ্ট খুবই প্রয়োজন। ক্ষুদ্র সন্চয়ের হিসেব রেখে সেই লক্ষ্যের একটি বাস্তবিক রূপরেখা তৈরি করা তখন সহজ। অনেক ব্যাংকের সন্চয়ী হিসেবে সুদ (প্রথাগত ব্যাংক) বা মুনাফার (ইসলামী ব্যাংক) ব্যবস্থাও থাকে। ব্যাংকে ক্ষুদ্র সন্চয় রেখে এবং সেই অর্থ ব্যবহার না করে আপনি আপনার অর্থের প্রবৃদ্ধিও দেখতে পারবেন। বিন্দু জলে সিন্ধু তখন আর অসম্ভব মনে হবে না। মনে হবে, রোজ আরো কিছু বিন্দু ঢালি, সিন্ধু যেন আরো গভীর হয়।

সবাইকে জৈষ্ঠের শুভেচ্ছা। 

বিন্দু জলেই হোক সবার সিন্ধু, আর সেই সিন্ধু থাকুক নিরাপদ।

কেতন শেখ






Comments

Popular posts from this blog

কেতন শেখ-এর কবিতা - রঙ

The Price of Money - Joishtho 1432

কেতন শেখ-এর কবিতা - ঘনান্ধকার