কেতন শেখ-এর গল্প - উপরোধ

 


কেতন শেখ-এর সুনির্বাচিত গল্প


উপরোধ 


           জামিল দাঁড়িয়ে আছে রূপসী বাংলা হোটেলের লবিতে। 

ও অপেক্ষা করছে লন্ডন ফিল্ম একাডেমীর গবেষক ইলেনোরা পডরেকার জন্য। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উপর একটা ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য ইলেনোরা বাংলাদেশে এসেছে। জামিলের কাজ হচ্ছে এই ডকুমেন্টারি তৈরীর কাজে ইলেনোরাকে সাহায্য করা। 
আজকে সকাল থেকে জামিল ইলেনোরার সাথে শহীদ মিনার আর ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে প্রায় চার ঘন্টা ঘুরেছে, আর ইলেনোরাকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছে। এই ভ্রমণে শুধু জামিলের কথাবার্তাই ছিলো না, ইলেনোরার নিজস্ব কাজও ছিলো। 

ইলেনোরা কিছু ভিডিও ইন্টারভিউ করেছে। সে ভাষাতত্ত্বের ছাত্রী ছিলো ... বাংলাসহ আটটা ভাষায় সমান দখল নিয়ে কথা বলতে পারে। এতে জামিলের সবচেয়ে বেশী সুবিধা হয়েছে। চার ঘন্টা ধরে ইংরেজিতে কথাবার্তা চালানোর মতো অবস্থা জামিলের না।

জামিল পড়াশোনায় কখনোই খুব একটা মনযোগী ছিলো না। বিএসসি ডিগ্রি করেছিলো একটা মফস্বলের কলেজ থেকে। সেটাতে চাকরির কোনো উপায় হয়নি। এরপর ব্রিটিশ কাউন্সিলে ইংরেজি কথা বলার কোর্স করেছিলো। সেই কোর্সে যতোটুকু ইংরেজি জানতো সেটাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলো একজনের কারণে। তিনি ছিলেন কোর্সের মূল শিক্ষক। তিনি ইংরেজি শেখানোর চেয়ে ইংরেজদের প্রশংসা করতে বেশি ব্যস্ত ছিলেন। তার কথা শুনে মনে হতো পৃথিবীতে ইংল্যান্ডের মতো এতো ভালো দেশ আর কোনোটা হতেই পারে না। 

ইংল্যান্ড ও ইংরেজদের আপাদমস্তক প্রশংসা করতে করতে তিনি কোর্সের তিন সপ্তাহ কাটিয়ে দিলেন। তিন সপ্তাহে জামিল শুধু তার ইংরেজি শুনলো, নিজে কিছুই শিখলো না। বরং এটা বুঝতে পারলো যে তার নিজের ইংরেজির দখল খুবই খারাপ। তাই ইলেনোরার বাংলা জানাটা জামিলের জন্য খুবই স্বস্তির একটা ব্যাপার। এই স্বস্তির সাথে কোনো কিছুর তুলনা হয় না।

এই মুহূর্তে জামিল অপেক্ষা করছে আজকের দিনের পরবর্তী সেশনের জন্য। ইলেনোরা তার কামরায়, একটু পরেই নীচে আসবে। জামিলের মনে হচ্ছে ইলেনোরা প্রচন্ড আবেগ নিয়ে এই ডকুমেন্টারিটা তৈরী করছে। সকাল থেকে অনেক উত্সাহ নিয়ে সে একটার পর একটা ইন্টারভিউ করছিলো। কাজের ফাঁকে জামিলের সাথে খুব আগ্রহ নিয়ে এসব ব্যাপারে কথাও বলছিলো। একটু পরপর বলছিলো, তোমাদের ভাষার ইতিহাস এতো গৌরবের!  এটাতো তোমাদের অনেক বড় সৌভাগ্য।

এসব ব্যাপার নিয়ে জামিল অবশ্য এখন আর তেমন কোনো আবেগ অনুভব করে না। ও এসেছে অন্য একটা কারণে। বিএসসি পাস করার পর এখন জামিল বেকার। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইংরেজি কোর্স করেও চাকরিবাকরির কোনো গতি হয়নি। ইলেনোরাকে সাহায্য করার জন্য ওর এক বড় আপা ওকে পাঠিয়েছেন। গত পরশুদিন তিনি জামিলকে ফোনে এই ডকুমেন্টারির বৃত্তান্ত দিয়ে বললেন, তুমি যদি এখন ওকে একটু হেল্প করো, তোমার জন্য লন্ডনে গিয়ে ফিল্মমেকিং-এর কাজ শেখার একটা ভালো সুযোগ তৈরী হতে পারে। ইলেনোরা এখন একজন রিসার্চ এসিসটেন্ট খুঁজছে। মানে গবেষণা সহকারী আর কি। তুমি যদি তোমার কাজ দিয়ে ওকে ইমপ্রেস করতে পারো, ও তোমাকে সেই এসিসটেন্টশীপের জন্য রেকমেন্ড করবে। ও রেকমেন্ড করলেই তুমি লন্ডন ফিল্ম একাডেমীতে ট্রেনিং-এর জন্য যেতে পারবে। এটা তোমার জন্য খুব ভালো একটা প্রসপেক্ট। আর সাদাদের সুপারিশ হচ্ছে পাক্কা সুপারিশ। ওরা যাকে একবার সুপারিশ করে, তার লাইফের সেটেলমেন্ট পাক্কা।

এসব কাজ আদতে ছুটা কাজ, চাকরি না। কিন্তু এসব ছুটা কাজের ভবিষ্যত হয়তো ভালো। আপার বলা সেই পাক্কা সুপারিশে লাইফের পাক্কা সেটেলমেন্টের খোঁজেই হয়তো আজকে জামিল এসেছে। একুশে ফেব্রুয়ারির অনুভূতি, উপলব্ধি বা চেতনা নিয়ে জামিলের খুব একটা ভাবনাচিন্তা নেই। ওর কাছে এসব ব্যাপার এখন একটা সামাজিক আর সাংস্কৃতিক আয়োজন। ফেব্রুয়ারিতে ভাষা দিবস, মার্চে স্বাধীনতা দিবস, এপ্রিলে পহেলা বৈশাখ, ইত্যাদি এখন শুধু অনুষ্ঠানই মনে হয়। প্রায়ই মনে হয় এসবের চেতনা নিয়ে কারও মনে কিছু আছে কি না। 

তবে আবেগ থাকুক আর না থাকুক, বাঙালী সবই উদযাপন করে। টিভি ক্যামরার সামনে চোখ ছলছল করে ভাষা শিক্ষা সংস্কৃতির কথা বলে। এরপর সেটা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। এখন আর এসবের কোনোটাই জামিলকে স্পর্শ করে না। জামিলের সামনে এখন অনেকগুলো বাস্তব সমস্যা। সেসব অনেক সমস্যার সমাধান হবে যদি ইলেনোরার পাক্কা সুপারিশ পাওয়া যায়। সেই উপরোধ পেয়ে একবার লন্ডনে যেতে পারলে এর পরে কি হবে সেটা পরে দেখা যাবে। এই মুহূর্তে জামিলের বিদেশ যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করা খুবই দরকার। জীবনের সমস্যা জীবনেই সমাধান করতে হয়, ফেসবুক পোস্টে সেগুলো করার উপায় নেই। যাদের জীবনের সমস্যা জটিল, একুশে ফেব্রুয়ারির আবেগঘন পরিবেশ বা সেই আবেগের ফেসবুক পোস্টে উহু আহা করার সময়ও তাদের থাকে না।

লিফ্ট থেকে ইলেনোরা বের হচ্ছে। ওর কাঁধে ঝোলানো ভিডিও ক্যামেরা,  হাতে একটা ফাইল ফোল্ডার। ইতালীয়ান অরিজিনের ব্রিটিশ, পয়ত্রিশের বেশী বয়স হবে না ... লম্বা একহারা গড়ন। জামিলের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত ভঙ্গিতে হেসে বললো, আমি ফ্রেশ হয়ে এলাম, কিন্তু তোমার এখন সেই উপায় নেই। সরি।

জামিল হেসে বললো, সরি বলতে হবে না। আমাদের কি আজকের কাজ শেষ ?

-  না ... তোমার সাথে আমার কিছু আলাপ আছে ... আমি কি তোমাকে ভিডিও ইন্টারভিউ করতে পারি?

-  তাতে যদি তোমার গবেষণার কোনো সুবিধা হয়, অবশ্যই করতে পারো।

-  তাহলে চলো আমরা লান্চ করতে করতে তোমার ইন্টারভিউটা করে ফেলি।

হোটেলের যেই রেস্তোরায় ওরা ঢুকলো সেটাতে বুফে লান্চের ব্যস্ততা প্রায় শেষের দিকে। এখনও প্রচুর খাবার আছে। লোকজনের ভিড় নেই। ভিড়ভাট্টা কম হলে বাংলাদেশে লোকজন খুশি হয়। বিদেশীরা হয় না। তারা এখানে ভিড় দেখতে আসে। খালি খালি রেস্তোরা দেখলে বলে, কি ব্যাপার, লোকজন কোথায় ?

খাবার নিয়ে টেবিলে বসে ইলেনোরা ভিডিও ক্যামেরাটা স্ট্যান্ডে রেখে জামিলের দিকে ফোকাস করলো। এরপর খাবার মুখে দিয়ে বললো, তোমার কিছু মতামত আমার রিসার্চে খুব কাজে আসবে। আর তোমার এই ইনপুট তোমার রেকমেন্ডেশনের জন্যও ইম্পর্টেন্ট। তুমি কি রেকমেন্ডেশনের ব্যাপারটা জানো ?

- হ্যা জানি।

- দেখো জামিল ... আমি তোমার কাজে ইমপ্রেসড, তবে এখনও রেকমেন্ড করার মতো ইমপ্রেসড না। তোমার সাথে আমার আজকে পর্যন্তই কাজ। তাই তোমাকে আমি রেকমেন্ড করবো কি করবো না, সেটা নির্ভর করছে তোমার এখনকার কথাবার্তার ওপর।

- আমি বুঝতে পারছি। বলো, কি জানতে চাও। তবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে আমি তোমাকে অনেক তথ্য অলরেডি দিয়েছি।

- সেসব বইয়ের কথা, বা গুগল সার্চের কথা। আমি সেসব তথ্য জানি। আমি জানতে চাই আজকের বাংলাদেশীদের মনে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে অনুভূতি কি ... আর এই ইতিহাস থেকে তারা কী কী শিক্ষা নিচ্ছে ... এসব। 

জামিল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, আমি যদি এখন ক্যামেরার সামনে এসব ব্যাপারে আমার সত্যিকারের মতামত দেই, তাহলে তোমার ডকুমেন্টারিতে বর্তমানের বাস্তব ঢুকে যাবে। তখন কিন্তু এই ডকুমেন্টারি কোনো গৌরবজ্জ্বল ইতিহাসের মেসেজ দেবে না, অন্য কোনো মেসেজ দেবে।-

- সেটা হোক ... দেখো জামিল, আজকে যেসব ইন্টারভিউ আমি করেছি, সেখানে আমার মনে হলো সবার মনে কোনো না কোনো একটা হতাশা আছে। ভয়ও আছে। রিকশাওয়ালা বলছে ভাষার ইতিহাস গর্বের ব্যাপার, কিন্তু দেশের অনেক সমস্যা আছে। ছাত্র বলছে কোনো ইতিহাস থেকেই দেশের রাজনীতিবিদরা কোনো শিক্ষা নিচ্ছে না। পথচারী বলছে ভাষা আমাদের গর্ব, কিন্তু এই দেশের শত্রু এখনও দেশেই আছে। সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে থাকা মা বলছে এই দিবস আমাদের জন্য গর্বের, কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি এখন বিপন্ন। এদের সবার মনে এতো কিন্তু কেন ? এরা সবাই এতো ভয়ে আর অনিশ্চয়তায় আছে কেন ?

- ইলেনোরা, তুমি যাদের কথা বলছো, এরা এই দেশের খুব সাধারণ মানুষ। এরা জীবনযুদ্ধে পুরোপুরিভাবে বিপর্যস্ত। এদের জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কাটে অনিশ্চয়তায়। তাই এদের জীবনের প্রতিটা অনুভূতি অনেকগুলো কিন্তু দিয়ে ভরা, অনেকগুলো জানি না দিয়ে ভরা। ভাষা আন্দোলনের পজিটিভ স্পিরিট মাখানো যেসব কথাবার্তা তুমি খুঁজছো সেসবের জন্য তোমাকে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী-কবি-সাহিত্যিক বা টকশো এক্সপার্টদের সাথে কথা বলতে হবে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে কথা বললে তোমাকে এসব হতাশা, জানি না, আর কিন্তুভরা কথাবার্তাই শুনতে হবে।

ইলেনোরা অল্প হেসে বললো, তুমি কোন দলের ... সাধারণদের দলের, না অন্য দলের ?

 - আমি যদি অন্য দলের হতাম, তাহলে তোমার সাথে সারাদিন রেকমেন্ডেশনের আশা নিয়ে ঘুরতাম না। আমি খুবই সাধারণ ... আমার কথাতেও হতাশা, জানি না, আর অনেকগুলো কিন্তু থাকে।

  -জামিল ... আমি জানি তোমাদের দেশের অনেক সমস্যা আছে। দারিদ্র্য আছে, ক্ষুধা আছে, বৈষম্য আছে, করাপশন আছে ... কিন্তু তাই বলে কি সাধারণদের মনে দেশের বা ভাষার গৌরবের ইতিহাস নিয়ে কোনো আনন্দ থাকবে না ?

 - তোমার প্রশ্নের উত্তর তোমার প্রশ্নের মধ্যেই আছে। তবে তুমি যাদেরকে হতাশাগ্রস্ত বলছো, কালকে সকালে সেসব মানুষরাই পরিবার নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসবে। এরা সারাদিনের অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে একবার হলেও নীরবে বুকভরা নিশ্বাস নিয়ে বাংলা ভাষার জন্য গর্ববোধ করবে। এদেরকে কোনো টিভি ফুটেজে দেখাবে না, এদের নামধাম পত্রিকাতে আসবে না। কিন্তু  এর পরও এরা এসব করবে।

- আর অন্যরা কি করবে ?

- অন্যরা আজকে রাত বারোটা থেকে আসবে। শহীদ মিনারে ফুল দেবে, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। ওদেরটা টিভিতে আসবে, পত্রিকায় আসবে। ওদের সাথে দলবল থাকবে, বড় ব্যানারে ওদের পরিচয় থাকবে। মাইকে ওদের নাম বলা হবে। ওদের ফুলের তোড়ায় বড় করে ওদের নাম লেখা থাকবে। সেসব ফুলের তোড়া দেখে মনে হবে শহীদদের থেকে ওদের গুরুত্বই বেশী। ওরা মনে মনে কি ভাববে সেটা আমি জানি না। তবে আমি জানি সাধারণদের ফুলের তোড়ায় কোনো নাম লেখা থাকে না। সাধারণরা সকালে শহীদ মিনারে এসে তাদের সারা বছরের হতাশা, দুঃখ, কষ্ট, অনিশ্চয়তা আর নির্যাতনের কথা একবারের জন্য ভুলে নতুন করে বাঁচার উদ্দীপনা নেবে। আমাদের ভাষার এই গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস থেকে তারা তাদের মতো করে প্রেরণা নেবে। তাদের দেয়া শ্রদ্ধান্জলি হবে শুদ্ধ, পবিত্র আর স্বতঃস্ফূর্ত। তাদের সেই চেতনাই ছিলো ভাষা আন্দোলনের সত্যিকারের চেতনা।

ইলেনোরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। এরপর সহজ স্বরে বললো, জামিল, যেই দেশের সাধারণরা এতো শুদ্ধ চেতনায় ভাষা আর দেশের সম্মানকে বুকে ধরে রাখতে পারে, সেই দেশে এতো সমস্যা কেন ? তোমাদের ভাষা কেড়ে নেয়ার প্রতিবাদে সাধারণরা আন্দোলন করে শহীদ হয়েছিলো। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে ভাষা আন্দোলনের এমন গৌরবের ইতিহাস নেই। অথচ তোমাদের দেশে সাধারণরা এখন দুঃসহ জীবনযাপন করছে, অনেক অবিচার সহ্য করছে। এসবের বিরূদ্ধে কোনো আন্দোলন হচ্ছে না ! এমন কেন হচ্ছে ?

জামিল থমথমে মুখে বললো, সেটা আমি জানি না। তবে এসব খুব সম্ভবত তোমার এই ডকুমেন্টারির কোনো বিষয় না।

ইলেনোরা হালকা করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এরপর ক্যামেরা অফ করে বললো, সাধারণদের কথাতো শুনলাম। তুমি কালকে কি করবে জামিল ?

- আমি তোমার রেকমেন্ডেশনের অপেক্ষা করবো।

- তোমার দেশ, দেশের মানুষ, আর ভাষা-সংস্কৃতির এই চেতনা ছেড়ে তুমি লন্ডনে চলে যেতে পারবে? সেখানে গিয়ে থাকতে পারবে?

জামিল কিছু বললো না। ইলেনোরা আবার বললো, তুমি তোমার জীবনে কি চাও জামিল ?

- আমি সেটা জানি না ইলেনোরা। আমার সামনে অনেকগুলো বাস্তব সমস্যা ... আমার কোনো চাকরী নেই, আমার বাবা বেঁচে নেই, সংসারে উপার্জনের কেউ নেই। আমার মা আর ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনার জন্য আমাকে উপার্জন করতে হবে। বাংলাদেশে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আমার দেশের বাইরে চলে যাওয়াটা খুব প্রয়োজন।

- তাই জামিল! আমার তো মনে হয় তুমি বাংলাদেশে থেকেই এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবে। যেই মানুষ দেশকে, দেশের ইতিহাসকে, আর দেশের মানুষকে এতো ভালোবাসতে পারে, তার জন্য তো এসব সাময়িক সমস্যা দেশে থেকেই সমাধান করা সম্ভব। তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসাগুলোকে ছেড়ে তুমি বিদেশে গিয়ে কিভাবে থাকবে জামিল?


জামিল চুপ করে থাকলো। ওর চোখে পানি এসে যাচ্ছে।

ইলেনোরা অল্প হেসে বললো, তোমার কাছে আমার প্রশ্নের উত্তর আছে জামিল ... কিন্তু তুমি উত্তরটা দিতে ভয় পাচ্ছো, দ্বিধাবোধ করছো। কারণ তুমি নিজেও তোমার দেশ আর দেশের মানুষকে ছেড়ে কোথাও যেতে চাও না। একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে রাখা একটা নামবিহীন ফুলের তোড়ায় ভাষা শহীদদের প্রতি তোমাদের সাধারণদের যেই প্রার্থনা আছে, তোমার জীবনের কাছে এই মুহূর্তে তোমার তেমনই কোনো যাচনা আছে। তাই আমি যদি তোমাকে এখন রেকমেন্ড করি, তুমি তোমার একটা পাওয়ার বদলে অনেক কিছুই হারাবে।

জামিল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, তুমি ঠিক বলেছো ইলেনোরা। তোমার রেকমেন্ডেশনে জীবনে আমি একটা কিছু হয়তো পাবো, কিন্তু তার বদলে হারাবো অনেক কিছু।

ইলেনোরা জামিলের দিকে তাকিয়ে হাসলো। ওর হাসিতে একটা মায়াভরা আবেশ আছে। সেই আবেশে থাকা অবস্থায় যে কোনো কথাকে মনেপ্রাণে মেনে নেয়া যায়।

জামিলের দিকে তাকিয়ে থেকেই ইলেনোরা বললো, তোমার সাথে ভবিষ্যতে কাজ করতে আমারই আগ্রহ বেশী, কিন্তু সরি জামিল .... আমি তোমাকে রেকমেন্ড করতে পারছি না। তোমার নামবিহীন ফুলের তোড়ার কথাটা মনের ভিতরে কেন জানি একটা অজানা কষ্ট দিয়ে গেছে। আমি সেই অজানা কষ্টটাকে আমার সাথেই রাখতে চাই ...... আমি সবসময় ভাবতে চাই যে বাংলাদেশে আমার এমন একটা বন্ধু আছে যে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে লাখো সাধারণের সাথে গিয়ে নামবিহীন একটা ফুলের তোড়া শহীদ মিনারে রেখে আসে, আর একবুক নিশ্বাস নিয়ে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের জন্য নীরবে গর্ববোধ করে। এরপর সে আবার নির্ভয়ে জীবনযুদ্ধে নেমে যায়।

জামিল অনেকক্ষণ পরে হাসলো। ইলেনোরার হাসিমুখে বলা সেই অজানা কষ্টের কথা শুনে ওর খুব ভালো লাগছে। কেন ভালো লাগছে সেটা অবশ্য ওর জানা নেই।


স্বত্ব - লেখক


Comments

  1. অসাধারণ একটি গল্প

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কেতন শেখ-এর কবিতা - রঙ

The Price of Money - Joishtho 1432

কেতন শেখ-এর কবিতা - ঘনান্ধকার